Hawa Bhavan 1
স্লো পয়জনিং-৫
২০০৩ সালে উত্তরা ৪ নং সেক্টরে একটা বাসায় কিছু ছাত্র মিলে একত্রে থাকতাম। ঐ বাড়ীটা পুরোটাই ব্যাচেলর ভাড়া দেয়া হত। আমি ছিলাম নিচ তলার এক রুমে। হঠাত একদিন দেখি রুমের সামনে আলো। এত আলো যে রাতে ঠিক মত ঘুমাতে পারলাম না। আলোর উৎস হল ঐ বাড়ীর সামনের খালী প্লটে একটা নিয়ন সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। ঐখানে পাঁচ তলা এপার্টমেন্ট তৈরি হবে। এপার্টমেন্টের কাস্টমার আকর্ষণ করার জন্যই ঐ সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। তখন ছিল এপার্টমেন্টের রমরমা ব্যবসা। সাইনবোর্ড লাগানো দোষের কিছু না কিন্তু সমস্যা হল ঐটার কারণে আমাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেল। পরদিন সকালে ঐ প্লটে হোস্টেলের এক সদস্য গেল। একজন দারোয়ান পেল, তাকে জিজ্ঞেস করল এখানকার চীফ কে? দারোয়ান একটা ফোন নম্বর দিল। ঐ ফোন নম্বরটা তাদের বিজ্ঞাপনেই দেয়া আছে। ঐ নম্বরে ফোন করে ওনাকে অনুরোধ করা হল যাতে রাত বারোটার পরে যাতে সাইনবোর্ডের আলো নিভিয়ে ফেলে। কিন্তু ঐ লোক ছেলেটার কথা শুনল না। বরং তার কথায় কেমন যেন তাচ্ছিল্য প্রকাশ পেল। ছেলেটিকে অবশ্য সেই লোক বলেছে “আমি বিকালে প্রজেক্টে আসছি”। বিকালে দুই রুম মেট গেল। ঐ লোকটির সাথে দেখা হল। লোকটি জানাল “এই লাইট রাতে নেভানো যাবে না”। ছেলে দুটি ইয়াং, ছাত্র মানুষ, রক্ত গরম। তারা হুমকি দিল। ঐ লোকটিও হুমকি দিল “এই ল্যান্ড ডেভেলাপার কোম্পানির মালিক তারেক জিয়া। কেউ এর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। বরং কিছু করতে গেলে তারই ক্ষতি হবে।”
কিছুক্ষন পরে দেখি পুলিশের এক এসআই এসে হাজির। সে আমাদের হোস্টেলে ঢুকে ছেলে দু’টিকে মোটামোটি শাসিয়েই গেল। এক ঘন্টা পরে উত্তরা ফ্রেন্ডস ক্লাবের এক মাস্তানকে ঐ পজেক্টে দেখা গেল। হোস্টেলের লোকজন ততক্ষনে তারেক জিয়া, খালেদা জিয়ার চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে শেষ। যে যেভাবে পারে গালি দিচ্ছে। কেউ বলছে “শালার পুত, খাইলে খা, দেশটারে তো খাইলি। আমাদেরকে একটু রাতে শান্তিতে ঘুমাইতে দে। আমরা কি তোর খাওয়ায় ভভাগ বসাইছি? আগামী ভোটে দেখাইয়া দিমু।” ঐ কোম্পানিটা যে তারেক জিয়ার তা তারা শিউর হল পুলিশের ঐ এসআইয়ের কথা শুনে। এসআই তাই বলল।
আমি ঐদিন রাত দশটায় হোস্টেলে ফিরেছিলাম। পোলাপাইন তো আমাকে দেখেই গালাগালি শুরু করল “ঐ তারেকের দালাল এসেছে। হ্যান ত্যান ইত্যাদি ইত্যাদি।” আমি পুরো ঘটনা শুনলাম। তখনই একজন ভাইকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম ‘ওমুক কোম্পানি’ কি তারেক জিয়ার? উনি উত্তর দিলেন “প্রধানমন্ত্রীর ছেলের কি খেয়ে দেয়ে কাজ নাই যে ডেভেলাপার কোম্পানি করবে? তবুও শিউর হওয়ার জন্য আমি ওনাকে ফোন করছি।” আধা ঘন্টা পরে তিনি ফোন করে জানালেন তারেক জিয়ার সাথে ওনার কথা হয়েছে, ঐ কোম্পানির নাম তিনি রাস্তার বিলবোর্ডে দেখেছেন। এর মালিককেও চিনেন না। উনি আরো জানালেন আগামীকাল সকালেই যেন উত্তরা থানার ওসিকে সেই এসআইয়ের বিরুদ্ধে একশান নেয় এবং কী একশান নিয়েছে সেটা যেন ওনাকে জানানো হয়। আমি দেরি করলাম না। সকালেই থানায় গেলাম। ওসির সাথে দেখা করতে চাইলাম, উনি ব্যস্ত। আমি বললাম “হাওয়া ভবন থেকে এসেছি।” কারেন্টের মত দ্রুত কাজ হল। ওসিকে ঘটনা বললাম “তারেক ভাইয়ের নাম ভাঙ্গিয়ে ওমুক কোম্পানি ব্যবসা করছে আর আপনার এক এসআইও সেই মিথ্যে কথা প্রচার করছে।” ওসি সাহেব হেসে বললেন “ভাই সবাই ই তো এখন ওনার নাম ভাঙ্গিয়ে চলছে। এই তো আপনিও তো বললেন –হাওয়া ভবন থেকে এসেছেন। আমি কীভাবে বুঝব আপনি কোন ভবন থেকে এসেছেন?” আমি ওনার কথায় লজ্জা পেলাম। আসলেই তো?
পুলিশের ওসির সাথে দেখা করার জন্য আমি নিজেও তো হাওয়া ভবনের নামে মিথ্যা কথা বললাম। সামান্য একটা সাইনবোর্ডের জন্য মিথ্যা বললাম আর বাকীরা না হয় কী করছে! পুলিশ ঐদিনই ঐ প্লট থেকে সাইন বোর্ড খুলে নেয়। আর উত্তরা ফ্রেন্ডস ক্লাবের সেই মাস্তান হোস্টেলে এসে আমাদের কাছে ক্ষমা চাইল। উনি কীভাবে যেন জেনেছেন আমি নাকি হাওয়া ভবনে যাই (সম্ভবত পুলিশের এসআই বলেছে)। একজন সন্ত্রাসী আমার কথা শুনে হোস্টেলের মেম্বারদের কাছে ক্ষমা চাওয়ায় আমার বুকটা ফুলে উঠেছিল। আসলেই তো হাওয়া ভবনের জোর আছে। অথচ বাস্তব ঘটনা কিছুই না। হাওয়া ভবন সম্মন্ধে পুরোতাই রিউমার।
কিছুদিন পরে ঢাকার গাবতলী টু বগুড়া একটা সুন্দর বাস ছাড়া হল। বাসের নাম TR Travels টিআর ট্রভেলস। ইপিজেড এলাকায় একটা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম “এই বাসের মালিক কে?” ট্রাফিক পুলিশ এসে উত্তর দিল “নাম দেখে চিনতে পারছেন না? তারেক রহমানের বাস। টি তে তারেক র তে রহমান! পরে শুনলাম এটাও ভুয়া খবর।
এই ধরনের অনেক ঘটনা আমার জানা আছে। এর মধ্যে একটা লুল ঘটনাও আছে যা আরেক পোষ্টে জানাব। এভাবে হাওয়া ভবন সম্মন্ধে সুবিধাবাদী একটা গ্রুপ সুবিধা নিতে গিয়ে হাওয়া ভবনের নাম পঁচিয়ে ফেলেছিল, সাথে ছিল নাস্তিক সাংবাদিকদের আখড়া প্রথম আলো, যুগান্তর সহ আরো অনেক পত্রিকা। তারা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ‘স্লো পয়জনিং’ করছিল যাতে তারেক পঁচে যায়। দেশে কোন ঘটনা ঘটলেই পত্রিকাগুলি নাম না উল্লেখ করে লিখত ‘গুলশানের একটা বিশেষ ভবণের কাজ”। মানুষ বুঝত এটা নিশ্চয়ই তারেক রহমানের অপকর্ম!
আজকের (৫ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ প্রতিদিন সহ বিভিন্ন আওয়ামী মিডিয়ার প্রথম পাতার খবর ছিল দুইটি। একটি হল ‘খালেদার সাথে সচিবদের গোপন বৈঠক’ আরেকটা হল ‘লন্ডনে তারেক রহমান ও খোকার গোপন বৈঠক
’
খালেদার বৈঠক নিয়ে আমি কিছু বলব না। আমি বলব ‘তারেক-খোকার বৈঠক’ নিয়ে।
তারেক রহমান একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও দুইবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর ছেলে। আর সাদেক হোসেন খোকা একজন স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক এমপি, সাবেক মেয়র ও সাবেক মন্ত্রী। তারেক রহমান যেই দলের সিনিয়ার ভাইস-চেয়ারম্যান খোকা সেই দলের ভাইস চেয়ারম্যান। তারেক রহমান আর খোকা যদি কোন মিটিং করে সেটা হবে খুবই স্বাভাবিক। তাহলে পত্রিকা কেন শিরোনাম করবে “তারেক-খোকার গোপন বৈঠক!”
গোপন বৈঠক শব্দ গুলোর মধ্যে একটা ‘অবৈধ’ ভাব আছে। আর বেশিরভাগ রাজনৈতিক সভা হয় ঘরের মধ্যে, নিরিবিলি, যেখানে বাইরের লোক ঢুকতে পারে না। কারন পলিসি মিটিং অন্যদের জানাতে দেয়া ঠিক না। তারেক জিয়া লন্ডনে থাকে এটা পাগলেও জানে আর বিএনপির মধ্যম সারির কোন নেতা যদি লন্ডনে যায় তাহলে অবশ্যই তিনি তারেকের সাথে দেখা করতে চাইবেন। এই ‘অতি স্বাভাবিক’ ঘটনাটাকে তারা শিরোনাম দিল “গোপন বৈঠক”।
ঠিক তেমনি দেখেন আমেরিকায় আওয়ামীলীগ নেতারা একই রকম মিটিং করলে শিরোনাম কী আসে? আসে “আমেরিকায় জয়-সুরঞ্জিতের আলোচনা” অথবা বৈঠক। গোপন শব্দ যোগ করে পাঠককে বিভ্রান্ত করা হয় না।
Comments
Post a Comment